রাজনীতিবিদ-কর্মকর্তাদের ২৪৩ কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছেন ঠিকাদাররা
বড় আকারের ঠিকাদারি কাজ পেতে গত কয়েক বছরে রাজনীতিবিদ, প্রকৌশলী, কর্মকর্তাদের ২৪৩ কোটি ৮৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা ঘুষ বা চাঁদা দিয়েছেন ঠিকাদাররা। যৌথ বাহিনী ও দুর্নীতি দমন টাস্কফোর্স এ তথ্য পেয়েছে উৎকোচদাতা ঠিকাদারদের কাছ থেকে। এ সময়ে শুধু ঠিকাদারি কাজ এবং কাজের বিল পেতেই রাজনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তাদের এ বিপুল অর্থ দিতে হয়েছে। এই চাঁদাবাজির তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন বিতর্কিত ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুন। এরপরই স্থান সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার। বড় অঙ্কের চাঁদা গ্রহণকারীদের মধ্যে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত রাজনৈতিক ব্যক্তি ছাড়াও একাধিক বর্তমান ও সাবেক চিফ ইঞ্জিনিয়ার এবং সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা রয়েছেন।
দুর্নীতি দমন টাস্কফোর্স সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিতর্কিত ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুন হাওয়া ভবনের ছত্রছায়ায় শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিতে পরিণত হন। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনেম লিমিটেড থেকে সিলেট ফ্রেঞ্চুগঞ্জ-জগদীশ্বর রোড, সিলেট ওসমানিয়া বিমানবন্দর নির্মাণ, যমুনা সেতু সংযোগ সড়ক ও বনানী-টঙ্গী-জয়দেবপুর ওভারলি প্রকল্পের কাজ বাবদ ১২ কোটি ৫ লাখ টাকা চাঁদা নেন। এ ছাড়া এনসিইএল’র কাছ থেকে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন প্রকল্প কাজ বাবদ (২ ও ৩ নং) ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং আইটিসিএস এমইএল জেভি থেকে রাজশাহী সিটি বাইপাস রোড ও মোমেনশাহী টাউন রোড প্রকল্প থেকে ৮৫ লাখ টাকা নেন গিয়াস উদ্দিন মামুন। মীর আখতার হোসেন লিমিটেড থেকে মামুন বিভিন্ন প্রকল্প ও কাজের বিপরীতে ১০ কোটি ৪৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা চাঁদা নিয়েছেন। এ ছাড়া ইসলাম ট্রেডিং কনসোর্টিয়াম থেকে ৭৫ লাখ টাকা, বিবিসিএল থেকে ৫৩ লাখ টাকা এবং রেজা কনস্ট্রাকশন থেকে বিএমপি-২০০২ প্রকল্প বাবদ ১ কোটি টাকা চাঁদা নিয়েছেন। গিয়াস উদ্দিন মামুনের গৃহীত মোট চাঁদার অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ২৮ কোটি ২৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এসব চাঁদাবাজির জন্য তার বিরুদ্ধে পৃথক পৃথক মামলা হচ্ছে। অনেক মামলায় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দীও দিয়েছেন মামুন।
বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানকে চাঁদা দেয়ার তথ্য দিয়েছে কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রেজা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড টাস্কফোর্সকে জানিয়েছে, তারা খুলনা বাইপাস রোড, ঢাকা-চট্টগ্রাম রোড ও ঝিটকা-হরিরামপুর রোডের কাজের জন্য ২ কোটি ১০ লাখ টাকা তারেক রহমানকে প্রদান করেছে। আল আমিন কনসোর্টিয়াম কাঞ্চন সেতু ও সংযোগ সড়কসহ কয়েকটি কাজের জন্য ৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা চাঁদা দিয়েছে তারেক রহমানকে। আইটিসিএল ডব্লিউসি৪সি ও ডব্লিউসি৪সি প্রকল্পের জন্য সাড়ে ৩৮ লাখ টাকা চাঁদা দেয়ার কথা জানিয়েছে।
বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের আমলে রেজা কনস্ট্রাকশন আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি শেখ হেলালকে দিনাজপুর-পঞ্চগড়-রংপুর এলাকার সড়কের মেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ (কর্মসূচি ২০০০ ও ২০০১) কাজের জন্য ১ কোটি ১৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা চাঁদা দিয়েছে।
দেশের শীর্ষ পর্যায়ের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনেম লিমিটেড প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তিকে চাঁদা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি পূর্বাঞ্চল উপশহরের মাটি ভরাট কাজের (সি-২৩ ও সি-২৫ নং প্রকল্প) জন্য বিএনপি নেতা গয়েশ্বর রায়কে ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা এবং একই কাজের পিপি-৭ প্রকল্পের মাটি ভরাটের কাজের জন্য ৬৭ লাখ টাকা চাঁদা দিয়েছে বলে দুর্নীতি দমন টাস্কফোর্সকে জানিয়েছে।
সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাকে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ১৭ কোটি ৫৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দেয়ার তথ্য প্রদান করেছে। এর বেশিরভাগই বিভিন্ন কাজের বিপরীতে দেয়া অর্থ। কিছু টাকা বিল পাসের জন্যও রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে ৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে বলে ঠিকাদাররা জানিয়েছেন। ঠিকাদারি কাজের জন্য কনস্ট্রাকশন কোম্পানিগুলো অনেক সরকারি কর্মকর্তাকে ১ কোটি টাকার ওপরে ঘুষ দিয়েছেন। আবার ছোট ছোট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চাঁদা আদায় করে বড় ঠিকাদারের মাধ্যমে তা পরিশোধ করেছেন। এভাবে বিভিন্ন কাজের জন্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসাইন লিমিটেডকে ১৪ কোটি ৩০ লাখ ৪ হাজার টাকা প্রদানের তথ্য দিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। এর বাইরে আরো দুটি কাজের জন্য মীর আখতার হোসেনকে ১ কোটি ২৯ লাখ ও ৪ কোটি ৭৫ লাখ ৪৮ হাজার ৯১৬ টাকা চাঁদা দিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে রেজা কনস্ট্রাকশনের আফতাবকে ৩ কোটি ৯ লাখ ২৬ হাজার টাকা চাঁদা দেয়ার তথ্য জানা গেছে।
সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কাজের জন্য ৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা দিয়েছে বলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো যৌথ বাহিনীকে জানিয়েছে। সাবেক মন্ত্রী মীর নাছির উদ্দিনকে ২ কোটি ৪৭ লাখ ৪২ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে বলে ঠিকাদাররা উল্লেখ করেছেন। সাবেক পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিন খান আলমগীরকে ২ লাখ টাকা চাঁদা দেয়া হয়েছে বলে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বাইরে বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, সাবেক এমপি মোসাদ্দেক আলী ফালুকে ৩ কোটি ১ লাখ টাকা এবং বাগেরহাটের সাবেক এমপি সেলিমকে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে বলে ঠিকাদাররা টাস্কফোর্সকে জানিয়েছেন।
সড়ক ও জনপথের প্রধান প্রকৌশলী ফয়জুর রহমানকে বিভিন্ন কাজের জন্য ৭ কোটি ৩৮ লাখ ৩৫ হাজার ৮০০ টাকা ঘুষ দিয়েছে বলে জানিয়েছেন ঠিকাদাররা। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ফজলুল হককে ৭ কোটি ২৬ লাখ ১৯ হাজার ৪০০ টাকা দিয়েছে বলে ঠিকাদাররা টাস্কফোর্সকে জানিয়েছেন। টাস্কফোর্সের তথ্য অনুযায়ী বিভিন্ন কাজ পেতে সাবেক যোগাযোগ সচিব রেজাউল হায়াতকে ৭ কোটি ৬১ লাখ ৪৩ হাজার টাকা এবং সাবেক যোগাযোগ সচিব শফিকুল ইসলামকে ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা দিয়েছেন ঠিকাদাররা। এর বাইরে উল্লেখযোগ্য উৎকোচ গ্রহীতাদের মধ্যে রয়েছেন সড়ক ও জনপথ বিভাগের এসিই আমজাদ হোসেন (১ কোটি ১০ লাখ টাকা), অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আজাদুর রহমান (৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা), নির্বাহী প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন (১ কোটি ২৪ লাখ টাকা), এসই ফিরোজ খান নূর ( ১ কোটি ৬ লাখ টাকা), প্রকল্প পরিচালক গিয়াস উদ্দিন (২ কোটি ৭১ লাখ টাকা), এলজিইডি’র হিসাবরক্ষক খলিলুর রহমান (১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা), করোলা করপোরেশনের কে এস শাহজাহান (৩ কোটি ২০ লাখ টাকা), সড়ক ও জনপথের প্রকল্প পরিচালক মোকতাদির বেলাল (২ কোটি ২০ লাখ টাকা), সিই রবিউল ইসলাম (১ কোটি ৫ লাখ টাকা), প্রকল্প পরিচালক শাহাবুদ্দীন (১ কোটি ১০ হাজার টাকা), এলজিইডি’র হিসাবরক্ষক সফিক (১ কোটি ৫৬ লাখ ৯২ হাজার টাকা) এবং প্রকল্প পরিচালক শাখাওয়াত হোসেন (২ কোটি ৫২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা)।
উপরোল্লিখিত ব্যক্তি ছাড়াও বিশেষ বিভাগ বা বিভাগের কর্মকর্তাদের উৎকোচ দেয়ার পৃথক তথ্য সংগ্রহ করেছে টাস্কফোর্স। এ হিসাবে সড়ক ও
জনপথ বিভাগকে কয়েক দফায় ২৪ কোটি ৫৮ লাখ ১৯ হাজার টাকা চাঁদা দেয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর বাইরে সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রকৌশলী ও হিসাব বিভাগের কর্মকর্তাদের ভিন্ন এক চালানে ৯ কোটি ৯ লাখ ২৯ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে।
Source:দৈনিক নয়া দিগন্ত Date:2007-05-08


